
গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে (ডিআর কঙ্গো) প্রাদুর্ভাব ঘটা প্রাণঘাতী ইবোলা ভাইরাস প্রাথমিকভাবে যা ধারণা করা হয়েছিল, তার চেয়েও হয়ত দ্রুত ছড়াচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) একজন প্রতিনিধি।
ইতিমধ্যেই দেশটিতে ইবোলা আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে আনুমানিক ১৩১ জনে দাঁড়িয়েছে এবং এই ভাইরাস সংক্রমণের সন্দেহ থাকা রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫১৩ জনে। কঙ্গোর স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্যামুয়েল রজার কাম্বা এ তথ্য জানিয়েছেন।
এর আগে কঙ্গোর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ৩৫০ জন সন্দেহজনক রোগীর মধ্যে ৯১ জনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছিল। সে সময় ডব্লিউএইচও ইবোলাকে আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্যে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে।
এবার কঙ্গোয় মৃতের সংখ্যা বাড়ার প্রেক্ষাপটে উদ্বেগ প্রকাশ করে মঙ্গলবারেই জরুরি কমিটির বৈঠক আহ্বান করেছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়াসুস।
সুমঙ্গলবার ইজারল্যান্ডের জেনিভায় ‘ওয়ার্ল্ড হেলথ অ্যাসেম্বলি’র অধিবেশনে ডব্লিউএইচও প্রধান বলেন, “আমি এই মহামারীর আকার ও গতি নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। রোববার আমি কঙ্গো ও উগান্ডার ইবোলা মহামারী নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগে জনস্বাস্থ্যে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছি।”
মঙ্গলবার ইবোলার প্রাদুর্ভাব নিয়ে আলোচনার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংন্থার জরুরি কমিটির বৈঠক হবে বলে জানান গেব্রিয়াসুস। এই জরুরি কমিটি আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত, যারা ডব্লিউএইচও প্রধানকে প্রযুক্তি ও কারিগরি বিষয়ক পরামর্শ দেওয়া এবং নানা সুপারিশ করে থাকেন।
কঙ্গোর ইতুরি প্রদেশে ডব্লিউএইচও-র প্রতিনিধি ড. অ্যান অ্যানসিয়া বিবিসি-কে বলেন, “আমরা এই প্রাদুর্ভাব নিয়ে যত বেশি তদন্ত করছি, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে, এটি ইতোমধ্যে অন্যান্য এলাকাতে ছড়িয়েছে।” ভাইরাসটি সীমান্ত পেরিয়েও কিছুটা ছড়িয়ে পড়েছে এবং অন্যান্য প্রদেশেও ছড়িয়েছে বলে জানান তিনি।
ওদিকে লন্ডনের ‘এমআরসি সেন্টার ফর গ্লোবাল ইনফেকশাস ডিজিজ অ্যানালাইসিস’-এর একটি গাণিতিক মডেলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, কঙ্গোয় ইবোলা আক্রান্তদের একটি বড় অংশই শনাক্তকরণের বাইরে থেকে গেছে এবং প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা ইতোমধ্যেই ১,০০০ ছাড়িয়ে গিয়ে থাকতে পারে।
এই গবেষণায় বলা হয়েছে যে, বর্তমানে ইবোলার প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে যতটা জানা গেছে, এর প্রকোপ তার চেয়েও বেশি এবং এর প্রকৃত মাত্রা কি তা এখনও অজানা।
কঙ্গোর স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্যামুয়েল রজার কাম্বা জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশটিতে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যাটি একটি অনুমান এবং ১৩১ জনের সবার মৃত্যুই ইবোলা ভাইরাসের কারণে হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।
আশঙ্কা করা হচ্ছে, গত ২৪ এপ্রিল প্রথম ইবোলা রোগী শনাক্ত হওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই এই ভাইরাসের বিস্তার শুরু হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক রেড ক্রস সতর্ক করে বলেছে, আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করা না গেলে এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়লে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে, যার প্রতিটি লক্ষণই বর্তমানে দৃশ্যমান।
কঙ্গোর ইতুরি প্রদেশে ডব্লিউএইচও-র প্রতিনিধি ড. অ্যান অ্যানসিয়া জানান, কঙ্গোর সোনা খনির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত প্রদেশ ইতুরি ইবোলা প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্রস্থল। সেখানে মানুষের ব্যাপক যাতায়াত রয়েছে।
ভাইরাসটি ইতিমধ্যেই উৎপত্তিস্থল থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকটে থাকা দক্ষিণ কিভু প্রদেশ এবং রুয়ান্ডা সমর্থিত বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রায় ৮ লাখ ৫০ হাজার জনসংখ্যার গোমা শহরেও ছড়িয়ে পড়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঙ্গোয় ইতিমধ্যেই ১২ টন চিকিৎসা সরঞ্জাম পাঠানো হয়েছে এবং মঙ্গলবার আরও ছয় টন জরুরি সুরক্ষা সামগ্রী পৌঁছানোর কথা রয়েছে। পাশাপাশি আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশ সীমান্তে নজরদারি জোরদার করেছে।
প্রতিবেশী রুয়ান্ডা কঙ্গোর সঙ্গে তাদের সীমান্ত সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে এবং উগান্ডা তাদের নাগরিকদের কোলাকুলি ও করমর্দন থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছে। ইতিমধ্যেই উগান্ডাতেও একজন ইবোলা রোগীর মৃত্যু হয়েছে।
ওদিকে কঙ্গোয় কর্মরত অবস্থায় ইবোলায় আক্রান্ত হওয়া এক মার্কিন নাগরিককে চিকিৎসার জন্য জার্মানিতে নেওয়া হচ্ছে। জার্মানির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সংবাদমাধ্যমে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) জানিয়েছে, আক্রান্ত ওই মার্কিন নাগরিক একজন মিশনারি দলের চিকিৎসক বলে ধারণা করা হচ্ছে এবং তিনি ছাড়া ভাইরাসের সংস্পর্শে আসা আরও অন্তত ছয়জন মার্কিনিকে সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে।
ইবোলার এই বিরল ‘বুন্দিবুগিও’ ধরণের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো অনুমোদিত টিকা বা ওষুধ নেই। তবে আফ্রিকা সিডিসি-র বিজ্ঞান বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ড. মোসোকা ফাল্লাহ জানান, বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা বিকল্প ভ্যাকসিন বা টিকা ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবেন।
মার্কিন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি ‘মের্ক’ উৎপাদিত ‘এরভেবো’ নামক একটি ভ্যাকসিন মূলত ইবোলার ‘জাইর’ স্ট্রেইন বা ধরণের জন্য ব্যবহৃত হলেও, প্রাণীর ওপর চালানো গবেষণায় দেখা গেছে, এটি বুন্দিবুগিওর বিরুদ্ধেও কিছুটা সুরক্ষা দিতে সক্ষম।

