
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে ইদানীং রূপচর্চায় একের পর এক ঘরোয়া টোটকা ও প্রাকৃতিক উপাদানের ব্যবহার রাতারাতি ট্রেন্ডে পরিণত হচ্ছে।
বর্তমান সময়ে টিকটক ও ইনস্টাগ্রামের স্কিনকেয়ার ইনফ্লুয়েন্সারদের মাঝে বড় ‘ক্রেজ’ হয়ে উঠেছে ‘ফ্ল্যাক্সসিড’ বা ‘তিসি বীজের তৈরি ফেইস মাস্ক’।
নেটিজেনদের দাবি, এই প্রাকৃতিক মাস্কটি মুখে লাগালে অবিকল ‘বোটক্স ইনজেকশন’-এর মতো ত্বক টানটান হয় এবং বলিরেখা এক নিমেষে গায়েব হয়ে যায়।
তবে কসমেটিক ও চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দাবি সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক এবং অতিরঞ্জিত।
‘হেলথ ডটকম’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তিসি বীজের জেল ত্বকের জন্য ভালো হলেও, তা কখনই বোটক্সের বিকল্প হতে পারে না।
‘বোটক্স ইফেক্ট’ দাবির পেছনের ফাঁদ
যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চর্মরোগবিদ্যার ‘ক্লিনিক্যাল ইনস্ট্রাক্টর’ ডা. হ্যাডলি কিং স্পষ্ট করে বলেন, “তিসি বীজের মাস্ককে বোটক্সের সঙ্গে তুলনা করা এক ধরনের বাণিজ্যিক চালাকি।”
চিকিৎসাবিজ্ঞানে বোটক্স মূলত ইনজেকশনের মাধ্যমে ত্বকের নিচের পেশি ও স্নায়ুর যোগাযোগ সাময়িকভাবে স্তব্ধ করে দেয়, যার ফলে পেশি সংকুচিত হতে পারে না এবং বলিরেখা কমে।
তিসির বীজের মাস্কের এমন কোনো ক্ষমতা নেই।
তাহলে এটি মাখলে মুখ টানটান লাগে কেন?
যুক্তরাজ্যের ‘দ্য বিউটি ল্যাব’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও জৈব-রসায়নবিদ ডা. মলি কেলি টাফম্যান ব্যাখ্যা করেন, “তিসির বীজে প্রচুর পরিমাণে ‘পলিস্যাকারাইড’ থাকে, যা পানির সংস্পর্শে এলে জেলের মতো ঘন আস্তরণ তৈরি করে। এই জেল যখন মুখে শুকিয়ে যায়, তখন ত্বকের ওপর একটি সাময়িক সূক্ষ্ম ফিল্ম বা প্রলেপ তৈরি হয়। ‘ফিল্ম’টি মেইকআপের প্রাইমারের মতো ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখে এবং চারপাশের চামড়াকে টেনে ধরে, যা সাময়িকভাবে ত্বককে টানটান ও মসৃণ মনে করায়।”
এটি শুধুই একটি বাহ্যিক ও সাময়িক চমক, যা মুখ ধুয়ে ফেলার কিছুক্ষণ পরই চলে যায়।
তিসি বীজের পুষ্টিগুণ ও কার্যকারিতা
তিসির বীজে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড এবং ‘লিগনান্স’ নামক অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট রয়েছে। তবে মাস্ক বা জেল আকারে এটি ত্বকের খুব গভীরে প্রবেশ করতে পারে না।
ডা. টাফম্যানের মতে, “এর আসল সুফল হল সম্পূর্ণ উপরিভাগের আর্দ্রতা কোনো বড় অনুষ্ঠানে বা উৎসবে যাওয়ার আগে ঝটপট তাৎক্ষণিক ‘গ্লো’ বা উজ্জ্বলতা পাওয়ার জন্য এবং খসখসে ত্বককে নরম করতে এই ঘরোয়া প্যাকটি ভালো প্রাকৃতিক বিকল্প।
এটি কোনো স্থায়ী বলিরেখা বা রোদে পোড়া দাগ দূর করতে পারে না।
তিসির বীজের মাস্ক তৈরির নিয়ম
চর্মরোগ ও সৌন্দর্য বিষয়ক মার্কিন বিশেষজ্ঞ আসমা আলালি এবং শান্তানি স্মিথ প্যানেল, ঘরে বসে এই মাস্ক তৈরির রেসিপি জানিয়েছেন।
উপকরণ: ২ টেবিল-চামচ আস্ত তিসি বীজ, ১ কাপ ফিল্টার করা বিশুদ্ধ পানি এবং একটি সুতি ছাঁকনি কাপড়।
পদ্ধতি: একটি পাত্রে পানি ও তিসি বীজ নিয়ে মাঝারি আঁচে জ্বাল দিতে হবে। তাপে ৫ মিনিট অনবরত নাড়তে হবে, যতক্ষণ না পানি ঘন হয়ে ডিমের সাদা অংশের মতো জেলি ভাব ধারণ করে।
জেলটি গরম থাকা অবস্থাতেই ছাঁকনি কাপড় দিয়ে ছেঁকে বীজগুলো আলাদা করে নিতে হবে, কারণ ঠান্ডা হলে জেলটি অতিরিক্ত শক্ত হয়ে যাবে।
পুরোপুরি ঠান্ডা হওয়ার পর এটি মুখে ১০ থেকে ২০ মিনিট লাগিয়ে রাখতে হবে।
ফ্রিজে একটি বাতাসহীন কাচের পাত্রে এই জেল সর্বোচ্চ ৭ দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা নিরাপদ।
ত্বকের ধরন অনুযায়ী মাস্ক তৈরির উপায়
ডার্ম ক্লাব-এর পডকাস্ট উপস্থাপক ও মার্কিন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. হ্যানা কোপেলম্যান, ত্বকের বিভিন্ন সমস্যা অনুযায়ী এই জেলের সঙ্গে ১ বা ২ ফোঁটা অন্য প্রাকৃতিক উপাদান যোগ করার পরামর্শ দেন।
শুষ্ক ও ব্রণ প্রবণ ত্বক: জেলের সঙ্গে ১ চা-চামচ খাঁটি মধু মিশিয়ে নিলে, মধুর অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল উপাদান ব্রণের ব্যাকটেরিয়া মারে এবং শুষ্কতা দূর করে।
লালচে ও সংবেদনশীল ত্বক: রোদ থেকে আসার পর ত্বকের জ্বালাপোড়া ও লালচে ভাব শান্ত করতে, তিসির জেলের সঙ্গে টাটকা অ্যালোভেরা জেল মেশানো উপকারী।
ত্বকের প্রদাহ: সামান্য এক চিমটি কাঁচা হলুদের গুঁড়া মিশিয়ে নিলে, ত্বকের অভ্যন্তরীণ প্রদাহ কমায়। তবে এটি সপ্তাহে সর্বোচ্চ দুয়েক বারের বেশি ব্যবহার করা অনুচিত।
মুখে মাস্ক বা জেল ব্যবহারের ৪টি ধারাবাহিক ধাপ
টেক্সাসের সৌন্দর্য-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আসমা আলালির পরামর্শ অনুযায়ী ফেস মাস্কটি ব্যবহারের সঠিক ৪টি ধাপ হল:
ধাপ ১ (প্যাচ টেস্ট বাধ্যতামূলক): মুখে জেলটি লাগানোর অন্তত ২৪ ঘণ্টা আগে কনুইয়ের ভেতরের চামড়ায় সামান্য জেল লাগিয়ে অপেক্ষা করে একটি ‘প্যাচ টেস্ট’ করে নেওয়া বাধ্যতামূলক, যেন কোনো অ্যালার্জির ঝুঁকি না থাকে।
ধাপ ২ (মুখ পরিষ্কার করা): একটি মৃদু ফেইসওয়াশ বা ক্লিনজার দিয়ে মুখ ও গলা ভালো করে ধুয়ে তোয়ালে দিয়ে আলতো করে মুছে সম্পূর্ণ শুষ্ক করে নিতে হবে। নোংরা বা তৈলাক্ত ত্বকে এই মাস্ক লাগালে লোমকূপ বন্ধ হয়ে ব্রণ হতে পারে।
ধাপ ৩ (মাখা ও সময়সীমা): পুরোপুরি ঠান্ডা হওয়া তিসি বীজের জেলটি আঙুলের ডগা বা একটি চওড়া ব্রাশের সাহায্যে নিচ থেকে ওপরের দিকে পুরো মুখে ও গলায় সমানভাবে লাগাতে হবে। চোখ ও ঠোঁটের চারপাশের সংবেদনশীল অংশ এড়িয়ে চলা নিরাপদ।
মাস্কটি মুখে ১০ থেকে সর্বোচ্চ ২০ মিনিট লাগিয়ে রাখতে হবে, বা যতক্ষণ না এটি সম্পূর্ণ শুকিয়ে চামড়াকে টেনে ধরে ততক্ষণ রাখতে হবে। মাস্ক মুখে থাকা অবস্থায় কথা বলা বা হাসা অনুচিত, এতে ত্বকে কৃত্রিম সুক্ষ্ম রেখা পড়তে পারে।
ধাপ ৪ (ধোয়া): ২০ মিনিট পর প্রথমে সাধারণ বা হালকা কুসুম গরম পানির ঝাপটা দিয়ে জেলটি নরম করে নিতে হবে এবং আলতো বৃত্তাকার মালিশে করে মুখ ধুয়ে ফেলতে হবে।
মুখ ধোয়ার পরপরই ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে একটি ভালো হালকা ময়েশ্চারাইজার মেখে নেওয়া উপকারী।
অ্যালার্জি সতর্কতা
শান্তানি স্মিথ প্যানেল সতর্ক করেন যে, “যদিও তিসির বীজের অ্যালার্জি বিরল, তবুও মুখে সরাসরি এটি মাখার আগে কনুইয়ের চামড়ায় সামান্য জেল লাগিয়ে ন্যূনতম ২৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করে একটি ‘প্যাচ টেস্ট’ করে নেওয়া বাধ্যতামূলক।
যাদের জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ: ডা. কোপেলম্যান স্পষ্ট করে বলেন, “মুখের চামড়া যদি কোথাও ফেটে যায় বা খোলা ক্ষত থাকে, তীব্র সানবার্ন বা রোদপোড়া থাকে, কোনো ‘ফাঙ্গাল ইনফেকশন’ থাকে, বা ত্বকে যদি গুরুতর একজিমা বা রোজাসিয়া নামক রোগ থাকে, তবে এই ঘরোয়া মাস্ক ব্যবহার করা যাবে না। এটি ত্বকের ক্ষতি আরও মারাত্মক করতে পারে।”

