
খাদ্যদ্রব্য দীর্ঘকাল সংরক্ষণ এবং তার পুষ্টিগুণ বাড়াতে ‘ফার্মেন্টেইশন’ বা গাঁজানো প্রক্রিয়ার ব্যবহার মানব সভ্যতায় হাজার বছরের পুরানো। তবে আধুনিক কসমেটিক ডার্মাটোলজির কল্যাণে এই প্রাচীন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিটি এখন বিশ্বজুড়ে রূপচর্চার বাজারে বিপ্লব ঘটিয়েছে, বিশেষ করে কোরিয়ান ও জাপানি রূপচর্চায় (কে-বিউটি) তারুণ্য ধরে রাখার চাবিকাঠি হিসেবে সমাদৃত।
সাধারণ চালের পানি, চা (কম্বুচা) বা বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ নির্যাসকে ল্যাবরেটরিতে সুনির্দিষ্ট অণুজীব বা ব্যাকটেরিয়ার সাহায্যে গেঁজিয়ে তৈরি করা হচ্ছে এই ‘ফার্মেন্টেড স্কিনকেয়ার’ বা ‘গাঁজানো প্রসাধনী সামগ্রী’।
স্বাস্থ্য ও রূপচর্চা-বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘হেলথ ডটকম’ এবং ‘বার্ডি ডটকম’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, সাধারণ প্রসাধনীর চেয়ে এই গাঁজানো উপাদানগুলো ত্বকের অনেক গভীর স্তর পর্যন্ত প্রবেশ করে কোষে কোলাজেনের উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করে।
ক্ষুদ্র অণু ও ত্বকের গভীরে পুষ্টির প্রবেশ
নিউ ইয়র্কের মাউন্ট সিনাই হসপিটালের চর্মরোগবিদ্যার ক্লিনিক্যাল অধ্যাপক ডা. জোশুয়া জেইচনার ব্যাখ্যা করেন, “সাধারণ প্রাকৃতিক উপাদানের (যেমন- সাধারণ চালের পানি বা ভেষজ নির্যাস) আণবিক গঠন বা ‘মলিকিউলার সাইজ’ অনেক বড় থাকে, যা ত্বকের শক্ত বহিরাবরণ ভেদ করে ভেতরে ঢুকতে পারে না।
ফার্মেন্টেইশন বা গাঁজানো প্রক্রিয়ার সময় প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন এনজাইমগুলো এই জটিল ও বড় প্রোটিন অণুগুলোকে ভেঙে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণুতে রূপান্তর করে ফেলে। এই আণবিক ক্ষুদ্রতার কারণে ফার্মেন্টেড সেরাম বা ক্রিমগুলো সাধারণ প্রসাধনীর চেয়ে অনেক দ্রুত এবং সহজে ত্বকের গভীর কোষে শোষিত হয়ে পুষ্টি সরবরাহ করতে পারে।”
‘স্কিন মাইক্রোবায়োম’ ও উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সুরক্ষা
মানুষের ত্বকের উপরিভাগে কোটি কোটি অণুজীব বাস করে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘স্কিন মাইক্রোবায়োম’ বা ত্বকের প্রতিরক্ষালয় বলা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোর বোর্ড-প্রত্যয়িত চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রাজানি কত্তা বলেন, “অতিরিক্ত কেমিক্যাল বা সাবান ব্যবহারের কারণে এই উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলো ধ্বংস হয়ে গেলে ত্বক শুষ্ক হয় এবং ব্রণের সমস্যা বাড়ে।”
তিনি আরও বলেন, “ফার্মেন্টেড প্রসাধনীগুলোতে (যেমন- ল্যাকটোব্যাসিলাস বা ইস্ট লাইসেট) প্রচুর পরিমাণে প্রোবায়োটিক এবং ল্যাকটিক অ্যাসিড থাকে, যা ত্বকের এই ‘পিএইচ’ ভারসাম্য বজায় রাখে এবং ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের আক্রমণ থেকে ত্বকের রক্ষাকবচকে সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করে।”
মেদহীন উজ্জ্বলতা
ফার্মেন্টেইশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রসাধনীর উপাদানের ভেতরে প্রাকৃতিকভাবে প্রচুর পরিমাণে অ্যামিনো অ্যাসিড, পেপটাইড এবং ‘অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট’ তৈরি হয়। এই উপাদানগুলো ত্বকের গভীরে গিয়ে ‘ফ্রি-র্যাডিক্যাল’ ধ্বংস করে এবং বুড়িয়ে যাওয়া কোষে নতুন করে কোলাজেন ও ইলাস্টিন প্রোটিন তৈরির গতি সচল করে।
ফলে বয়স ৩০ পার হলেও মুখের চামড়া ঝুলে পড়ে না, মেছতার জেদি কালো দাগ দূর হয় এবং ত্বক কাচের মতো চকচকে বা ‘গ্লাস স্কিন’ রূপ ধারণ করে।
রূপচর্চায় ব্যবহৃত উপযুক্ত ফার্মেন্টেড উপাদান
ফার্মেন্টেড রাইস ওয়াটার বা গাঁজানো চালের পানি: এটি কোরিয়ান রূপচর্চার প্রধান ভিত্তি, যা মেছতার দাগ হালকা করে এবং প্রাকৃতিকভাবে মেলানিনের অতিরিক্ত উৎপাদন রুখে দেয়।
কম্বুচা বা গাঁজানো ব্ল্যাক টি: এতে থাকা ভিটামিন বি এবং প্রাকৃতিক অ্যাসিড ত্বকের খসখসে-ভাব দূর করে সতেজতা এনে দেয়।
গ্যালাক্টোমাইসেস ফারমেন্ট ফিল্ট্রেট: এটি এক ধরনের বিশেষ পুষ্টিকর ইস্ট, যা লোমকূপ ছোট করতে এবং অতিরিক্ত তৈলাক্ত-ভাব নিয়ন্ত্রণ করতে জাদুকরী কাজ করে।
অ্যালার্জি বিষয়ক সতর্কতা
ডা. রাজানি কত্তা সতর্ক করে বলেন, “ফার্মেন্টেড বা গাঁজানো উপাদানগুলো অত্যন্ত সক্রিয় এবং ঘনীভূত হওয়ায়, যাদের ত্বক অতিরিক্ত সংবেদনশীল কিংবা যারা ‘ফাঙ্গাল একনি’ বা একজিমার সমস্যায় ভুগছেন, তাদের ক্ষেত্রে এই উপাদানগুলো ফাঙ্গাসের বৃদ্ধি বাড়িয়ে তীব্র চুলকানির সৃষ্টি করতে পারে।”
তাই মুখে সরাসরি ব্যবহারের পূর্বে কনুইয়ের চামড়ায় সামান্য সেরাম লাগিয়ে অন্যতম ২৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করে একটি ‘প্যাচ টেস্ট’ করে নেওয়া বাধ্যতামূলক।

